সংবাদ সম্মেলনে বাণিজ্য উপদেষ্টা

যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে বাংলাদেশের ৮৬ শতাংশ পণ্য

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি (এআরটি) অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে রফতানি করা ৮৫-৮৬ শতাংশ পণ্য শূন্য শুল্কে মার্কিন বাজারে প্রবেশের সুযোগ পাবে।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি (এআরটি) অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে রফতানি করা ৮৫-৮৬ শতাংশ পণ্য শূন্য শুল্কে মার্কিন বাজারে প্রবেশের সুযোগ পাবে। এছাড়া বাকি ১৪-১৫ শতাংশ রফতানি পণ্যের ওপরে থাকবে ১৯ শতাংশ রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ। বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ‘এগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেড (এআরটি)’ শীর্ষক চুক্তি স্বাক্ষর নিয়ে গতকাল সচিবালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন এ তথ্য জানান।

বাণিজ্য উপদেষ্টা বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল বাজার। এ বাজারে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে সরকার প্রথম ধাপে শুল্কহার ৩৭ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২০ শতাংশে নামাতে সক্ষম হয়। পরবর্তী সময়ে আলোচনার মাধ্যমে তা আরো কমিয়ে ১৯ শতাংশে নামানো হয়েছে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশী পণ্যের ওপর মোট শুল্কহার আগের ৩৫ শতাংশ থেকে কমে ৩৪ শতাংশে দাঁড়াবে।’

চুক্তির বড় অর্জনের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘সহজভাবে বললে আমাদের ৮৫ বা ৮৬ শতাংশ রফতানির ওপরে শূন্য এবং ১৪-১৫ শতাংশের ওপরে ১৯ শতাংশ শুল্ক (রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ) হবে।’ এ ক্ষেত্রে তার যুক্তি, বাংলাদেশের রফতানি পণ্যের প্রায় ৮৬ শতাংশই তৈরি পোশাক। এখন এ পোশাক তৈরিতে যদি যুক্তরাষ্ট্রের তুলা ব্যবহার করা হয়, তাহলে সেই পোশাক মার্কিন বাজারে রফতানি করতে কোনো শুল্ক (রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ) দিতে হবে না।

শেখ বশিরউদ্দীন বলেন, ‘বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ তুলা আমদানিকারক দেশ। কারণ বাংলাদেশ যে পরিমাণ তৈরি পোশাক রফতানি করে, তার কোনো তুলা এখানে হয় না। মাত্র ২ শতাংশ তুলা বাংলাদেশে উৎপাদন হয়। বাকি ৯৮ শতাংশ আমাদের ন্যাচারালি আমদানি করতেই হয়।’ এ বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্রের তুলা ব্যবহারে একদিকে যেমন শুল্ক সুবিধা পাওয়া যাবে, অন্যদিকে দেশটির সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কমাতেও তা সহায়ক হবে বলে যোগ করেন তিনি।

বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে কৃষি ও জ্বালানি পণ্য এবং ট্র্যাডিশনাল মেটাল স্ক্র্যাপসহ বেশকিছু পণ্য আমদানি করার কথাও বলেন শেখ বশিরউদ্দীন।

প্রয়োজনে এ চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ রয়েছে জানিয়ে বাণিজ্য উপদেষ্টা বলেন, ‘এ চুক্তির মধ্যে আমাদের এ শর্ত যুক্ত আছে যে যদি প্রয়োজন হয়, আমরা একটা অ্যাপ্রোপ্রিয়েট নোটিস দিয়ে এ চুক্তি থেকে বের হয়ে আসতে পারব। পরবর্তী সরকার যদি মনে করে যে কোনো কারণে তাদের জন্য এটা উপযুক্ত নয়, সেটার ব্যাপারেও আমরা সচেতন ছিলাম। আমরা এটাকে (এক্সিট ক্লজ) চুক্তিতে সন্নিবেশ করেছি। এই মোটা দাগে আমাদের অর্জন।’

সংবাদ সম্মেলনে শেখ বশিরউদ্দীন আরো জানান, সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সরকার গঠনের পরপরই নিজের কর্মক্ষেত্রে ফিরে যাবেন। এ সময় তাকে ভুলে যেতে এবং ক্ষমা করে দিতেও অনুরোধ জানান। বাণিজ্য উপদেষ্টা বলেন, ‘সরকারে আসার সময় আমার তেমন কোনো অভিজ্ঞতা ছিল না। তবে চেষ্টার কোনো কমতি রাখিনি। আল্লাহর রহমতে সৎভাবে কাজ করার চেষ্টা করেছি। কারো প্রতি বৈষম্য বা স্বজনপ্রীতি করিনি।’

তার দায়িত্বকালীন সময়ে ছোট খামারি ও বড় উদ্যোক্তা—উভয় পক্ষকেই অন্তর্ভুক্ত রেখে সরকার একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক নীতির পথে এগিয়েছে বলেও মন্তব্য করেন শেখ বশিরউদ্দীন। তিনি বলেন, ‘এ নীতির মূল লক্ষ্য ছিল কাউকে বাদ না দিয়ে সবাইকে সঙ্গে নিয়ে এগোনো।’

সবশেষে বাণিজ্য উপদেষ্টা বলেন, ‘ইনশা আল্লাহ নতুন সরকার গঠন হওয়ার পর সঙ্গে সঙ্গে আমি আমার কর্মজীবনে ফেরত যাব। আশা করি আপনারা আমাকে ভুলে যাবেন এবং মাফ করে দেবেন। আমি ভুলে থাকতে চাই। আমি কখনই কোনো যোগাযোগমাধ্যমে আসিনি আগে। আমি আপনাদের মাধ্যমে একটি স্বনির্বন্ধ অনুরোধ করতে চাই, শেষ অনুরোধ যে আমাকে দয়া করে ভুলে যাবেন।’

সংবাদ সম্মেলনে বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘চুক্তির পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র “‍পটেনশিয়াল ট্যারিফ অ্যাডজাস্টমেন্ট ফর পার্টনার কান্ট্রিস” নামে অতিরিক্ত একটি সুবিধা দিয়েছে। এর আওতায় আড়াই হাজারের বেশি পণ্যে ডিউটি ফ্রি সুবিধা পাওয়া যাবে।’

তিনি জানান, ফার্মাসিউটিক্যালস খাত এ সুবিধার সবচেয়ে বড় অংশ পাবে। পাশাপাশি প্লাস্টিক পণ্য, উড়োজাহাজের যন্ত্রপাতি, প্লাইউড বোর্ডসহ আরো কিছু পণ্য এ তালিকায় রয়েছে।

উল্লেখ্য, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় বসার পর ২০২৫ সালের ২ এপ্রিল শতাধিক দেশের ওপর উচ্চ হারে শুল্ক আরোপ করেন। বাংলাদেশের ওপর বাড়তি ৩৭ শতাংশ শুল্কের ঘোষণা আসে। পরে দরকষাকষি করে এ হার ২০ শতাংশে নামে, যা ১ আগস্ট কার্যকর হয়। আর আগে থেকেই বাংলাদেশী পণ্যে ছিল ১৫ শতাংশ শুল্ক; সব মিলিয়ে শুল্ক দাঁড়ায় ৩৫ শতাংশ।

বাড়তি এ শুল্ক আরোপের পর থেকে অন্তর্বর্তী সরকার টানা নয় মাসের বেশি সময় ধরে তা কমাতে মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে আসছিল। পরে সোমবার দুই দেশের মধ্যে ‘এগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেড (এআরটি)’ শীর্ষক চুক্তিটি স্বাক্ষর হয়। নতুন চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশী পণ্য রফতানিতে এখন সম্পূরক শুল্ক দিতে হবে ১৯ শতাংশ। তাতে করে মোট শুল্কহার আগের ৩৫ শতাংশ থেকে কমে ৩৪ শতাংশে দাঁড়াবে।

আরও